অশুদ্ধি-সংশোধন পর্ব ১

অশুদ্ধি-সংশোধন

অশুদ্ধি সংশোধন এর গুরুত্ব

প্রতিটি ভাষায় লেখা ও ছাপার সময় নানা ভুল-ভ্রান্তি হয়। বেশির ভাগ ভুলই হয় ব্যাকরণগত জ্ঞানের অভাবে। অসাবধানতার কারণেও শব্দ-বাক্যের অশুদ্ধ প্রয়োগ হতে পারে। সঠিকভাবে ভাষা চর্চার মাধ্যমে শুদ্ধভাবে লেখার অভ্যেস গড়ে ওঠে। অর্থাৎ ভাষা-দক্ষতা তৈরি হয়ে গেলে সঠিকভাবে ভাষা ব্যবহার করা যায়। ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ জানা না থাকলে বাক্য সঠিক হয় না, শব্দের প্রয়োগ ভুল হয়, ফলে লেখকের ভাষা জ্ঞান সম্পর্কে পাঠকের সন্দেহ জাগে। মুদ্রিত লেখার ‘ভুল’ শিক্ষার্থী সঠিক হিসেবে গ্রহণ করে। এভাবেই ভাষা অশুদ্ধ হয়ে পড়ে। কাজেই ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা ভাষায় লেখার ক্ষেত্রে কী কী ত্রুটি দেখা যায় ?

সাধারণত কয়েক প্রকারের ত্রুটি লেখার ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়।
ক. বানানের ভুল;
খ. শব্দ ও পদের অপপ্রয়োগ;
গ. বাক্য গঠনের ত্রুটি;
ঘ. প্রয়োগের বাহুল্য;
ঙ. সাধু চলিতের মিশ্রণ।

বানানের ভুল

বাংলা ভাষায় শব্দ যেভাবে উচ্চারণ করা হয় বানান সেভাবে হয় না। উচ্চারণ হয় বাঙালিদের মতো বা বাংলা ভাষায়, আর বানান হয় সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে। তাছাড়া, ব্যাকরণের নিয়মাবলি সূক্ষ্মভাবে না জানার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রায়শ ভুল করে থাকে। বানানের ভুল বাংলা বানানের নিয়ম অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। এখানে প্রায়শ ভুল হয় এমন কিছু শব্দের বিষয়ে আলোচনা করার হলো:

তা প্রত্যয় যোগে গঠিত শব্দের ক্ষেত্রে-শব্দের মধ্যে হ্রস্ব-ই-কার হয়। যেমন:
সত্যবাদী => সত্যবাদিতা – মনোযোগী => মনোযোগিতা
উপকারী => উপকারিতা – প্রতিদ্বন্দ্বী => প্রতিদ্বন্দ্বিতা
সহকারী => সহকারিতা – উপযোগী => উপযোগিতা

স্ত্রীবাচক শব্দের ভুল

বাংলায় সাধারণ ই, অ, ইনী, ঈনী প্রত্যয় যোগে পুরুষবাচক শব্দকে স্ত্রীবাচক শব্দে পরিবর্তন করা হয়। তবে সংস্কৃতের অনুসরণ করতে গিয়ে অনেক সময় বাংলায় ভুল প্রয়োগ হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকার ফলে সেই ভুল এখন শুদ্ধ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। তবে, ইদানীং সব পুরুষবাচক শব্দকেই স্ত্রীবাচক শব্দে পরিণত করার বিরুদ্ধে মত জোরদার হচ্ছে। অর্থাৎ নারীকে আলাদা করে দেখার মানসিকতা কমে যাচ্ছে। তবে, এখন অনেক প্রয়োগ রয়ে গেছে। নারীরা এখন সম্পাদক, প্রভাষক হিসেবেই নিজের পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। হয়তো ভবিষ্যতে স্ত্রীবাচক শব্দ আরো হ্রাস পাবে।

ই ঈ আ ইনী ঈনী প্রয়োগ

বিশেষ্য ও বিশেষণের সাথে স্ত্রীবাচক ঈ প্রত্যয় যোগে সংস্কৃত শব্দকে স্ত্রীবাচক শব্দে পরিণত করা হয়। যার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ, এসব সব সময় নারী বা পুরুষকে নির্দেশ করে না।

যেমন: অবোধমুখ, ভয়ংকর, ম-ল, সংশোধন এর সাথে ঈ প্রত্যয় যোগে হয়েছে অধোমুখী, ভয়ংকরী, ম-লী, সংশোধনী। এর আসলে কোন দরকার নেই। ইভা ভয়ংকরী মেয়ে না বলে ইভা ভয়ংকর মেয়ে বললে কোন ক্ষতি নেই।

আরো উদাহরণ: চঞ্চল > চঞ্চলা, নিষ্ফল > নিষ্ফলা, ভীষণ > ভীষণা, কুরূপ > কুরূপা, অনাথ > অনাথা, অর্থকর > অর্থকরী ইত্যাদি।

কতকগুলো বিবেচ্য পদকেই প্রত্যয় যোগে পুরুষবাচক শব্দে পরিণত করা হয়, আবার সেই শব্দকেই ইন + ইনী যোগে স্ত্রীবাচক করা হয়। যেমন:

অভিমান > অভিমানী > অভিমানিনী
বিরহ > বিরহী > বিরহিনী
সহপাঠ > সহপাঠী > সহপাঠিনী
অপরাধ > অপরাধী > অপরাধিনী
দুঃখ > দুঃখী > দুঃখিনী

তৎসম শব্দ পুরুষবাচক শব্দের সাথে প্রত্যয় যোগ করে স্ত্রীবাচক শব্দ করা হয়। এই সমস্ত শব্দে আবার নতুন করে স্ত্রী প্রত্যয় যোগ করা হয়, যা সঠিক নয়। যেমন: অভাগী > অভাগিনী, চাতকী > চাতকিনী, পিশাচী > পিশাচিনী। এখানে অভাগী, চাতকী, পিশাচী স্ত্রীবাচক শব্দ।

সংস্কৃতে আ প্রত্যয় যোগে স্ত্রীবাচক শব্দ গঠিত হয়। অনাথা, সুকেশা, সুনয়না। বাংলায় এই স্ত্রীবাচক শব্দকে নতুন করে ইনি বা ইনী প্রত্যয় যোগে স্ত্রীবাচক শব্দে রূপান্তর করা হয়। যার কোন প্রয়োজন ছিল না। তবু, বাংলায় তা প্রচলিত হয়ে গেছে বলে সঠিক ধরা হয়।

অনাথা > অনাথিনী, সুকেশা > সুকেশিনী, সুনয়না > সুনয়নী ইত্যাদি।

অন্যান্য প্রয়োগ

সংস্কৃতজাত অনেক শব্দ আছে যেসব শব্দ বাংলাতে ইকারসহ ব্যবহৃত হয়। গুনিন, মন্ত্রিন > গুণী, মন্ত্রী। বাংলায় এদের সাথে বিভক্তি যুক্ত হয়ে বহুবচন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রা, এরা, দের, গণ, কুল ইত্যাদি বিভক্তি সাধারণত যুক্ত হয়ে থাকে। এই জাতীয় বহুবচন বা অন্যপদের প্রয়োগের উদাহরণ: প্রাণী > প্রানিজ, প্রাণিজগৎ, প্রাণিবিজ্ঞান, এখানে হ্রস্ব-ই কার হয়।

শশী > শশিকর, শশিকলা, শশিনাথ।
স্থায়ী > স্থায়িকাল, স্থায়িত্ব।
বন্দী > বন্দিরা, বন্দিশালা, বন্দিনির্যাতন।

সম্ভাষণ জাতীয় শব্দের বানান

পুরুষের সম্ভাষণের ক্ষেত্রে শব্দ এ-কারের পর ষ হয়।
স্ত্রীবাচক সম্ভাষণের ক্ষেত্রে আ-কারের পর সু হয়।
কল্যাণ > কল্যাণীয়েষু, কল্যাণীয়াসু (স্ত্রী)
প্রীতিভাজন > প্রীতিভাজনেষু, প্রীতিভাজনাসু (স্ত্রী)
শ্রদ্ধাভাজন > শ্রদ্ধাভাজনেষু, শ্রদ্ধাভাজনাসু

সন্ধিজাত ভুল

সন্ধির প্রথম অংশের শেষ ব্যঞ্জন ম হলে দ্বিতীয়াংশের গোড়ায় ব্যঞ্জন অন্তস্থ বা উষ্মবর্ণ হলে সন্ধির ফলে ম স্থলে অনুকার হয়;
সংবাদ (সম+বাদ, প্রথম অংশের শেষ ব্যঞ্জন ম, দ্বিতীয়াংশের প্রথম ব্যঞ্জন অন্তঃস্থবর্ণ) সংযোগ, সংবর্ত, কিংবা, কিংশুক, সংলাপ, সংসার, সংহত ইত্যাদি।
বিসর্গ সন্ধির ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা রয়েছে। যেমন:
ইতঃপূর্বে অথচ ইতোমধ্যে,
অধঃপাত অথচ অধোমুখ।
এরকম আরো উদাহরণ: বয়ঃক্রম, বয়ঃপ্রাপ্ত, মনঃপুত, মনঃসংযোগ, অথবা বয়োজ্যেষ্ঠ, বয়োবৃদ্ধ, মনোনয়ন, মনোযোগিতা, মনোলোভা, মনোরঞ্জন, শিরোধার্য (শিরঃপিড়া), মনোবিজ্ঞান ইত্যাদি।

সন্ধি বিষয়ক শুদ্ধ প্রয়োগ

অত্যধিক, অধ্যাপনা, তাড়িত, ত্যক্ত, দূষণীয়, অদ্যাপি, এবংবিধ, ঐরাবত, দধীচি, গ্রহীতা, জীবিকা, তৎকালীন, নিরীক্ষণ, নিমীলিত, পৃথগন্ন, মনোহর, কৌতূহল, পিশাচ, অনটন, অদ্যাবধি, প্রাতরাশ, মুখচ্ছবি, উপর্যুপরি, উপর্যুক্ত, দুরবস্থা, জগদ্বন্ধু রক্তচ্ছবি, সম্মুখ, চক্ষুরোগ, ব্যগ্র ইত্যাদি।

সমাস ঘটিত ভুল

ইন-প্রত্যয় যোগে নিষ্পন্ন শব্দের প্রথমার এক বচনের ব্যবহারে বাংলায় পাপী, ধনী, গুণী, মানী ইত্যাদি হয়। তবে, নি: উপসর্গযোগে সমাসবদ্ধ হলে শব্দের শেষে ঈ-কার হয় না। সেখানে পাপ, ধন, গুণ, মান ইত্যাদি শব্দের সমাস হয়। যেমন: নেই গুণ যার-নির্গুণ, নেই ধন যার-নির্ধন।

আরো উদাহরণ: নিরাপরাধ (অশুদ্ধ-নিরপরাধী) নিরহঙ্কার, নিজ্ঞান, নির্দোষ, নির্ধন, নীরোগ, নিরভিমান, নীরদ।

সমাসঘটিত আরো শুদ্ধি: অহোরাত্র, অল্পজ্ঞান, অধিবাসিগণ, কালিদাস, কদন্ন, ছাগদুগ্ধ, জাহ্নবীজল, কদর্থ, গুণিগণ, পক্ষিজাত, প্রণয়িযুগল, পরমাসুন্দরী, পিতাঠাকুর, ফণিভূষণ, যোগিবর, শঙ্কিত, মহিমময়, যোদ্ধাগণ, রোগিসেবা, বিনয়পূর্বক, অভিনেতৃগণ, ছাত্রছাত্রীগণ, ভ্রাতৃবৃন্দ, দিবারাত্র, সাবধান, স্থায়িভাবে পক্ষিশাবক, প্রাণিহত্যা, সলজ্জ ইত্যাদি।

প্রত্যয় ঘটিত অশুদ্ধি

শুদ্ধ প্রয়োগ: অস্তায়মান (অস্তমান নয়), অজ্ঞাত, আধিক্য, উৎকর্ষ, উৎকৃষ্টতা (উৎকর্ষতা নয়), অসহ্য, অলসতা, আলস্য, আরক্তিমা, আরক্ত, একত্র, একতা, ঐক্য, ঔদাসীন্য, উদাসীনতা, যাবতীয়, লঘুতা, চুষ্য, গৌরব, চাঞ্চল্য, চঞ্চলতা, দ-ণীয়, দারিদ্র্য, নিন্দক, নির্দোষতা, প্রসার, সৌন্দর্য, সাধুতা, গ্রাহ্য, ঘূর্ণমান, চলিষ্ণু, বুদ্ধিমত্তা, বাহ্য, নিরাপৎসু, পার্বত্য, পর্বতীয়, ধৈর্য, চক্ষুষ্মান, সৌজন্য, সুরভি, ভদ্রতা, ঐকমত্য ঐকতান, আর্থনীতিক ইত্যাদি।

প্রত্যয়জনিত অশুদ্ধি

প্রত্যয়ের ভুল প্রয়োগের ফলে অনেক শব্দ অশুদ্ধ হয়ে পড়ে।

শুদ্ধ প্রয়োগ: অধীন, অদ্যাপি, আবশ্যক, অসহনীয়, পূজ্যস্পদ, সর্বদা, বিবদমান, বৈচিত্র্য, ব্যাকুল, মাহাত্ম্য, মহত্ত্ব, মাননীয়, মান্য, সত্তা, সম্ভ্রান্ত, সম্ভ্রমশালী, সাধ্য, জ্ঞানবান, ঘূর্ণমান, ঘূর্ণায়মান, দুর্লঙ্ঘ্য, দৌরাত্ম্য, সেচন।

তা প্রত্যয়ের অপপ্রয়োগ

তা, ত্ব প্রত্যয় শুধু বিশেষণকে বিশেষ্য করে। কাজেই বিশেষ্য শব্দের সাথে তা বা ত্ব নতুন করে প্রয়োগ করা অশুদ্ধ। যেমন: উৎকর্ষ বিশেষ্য তার বিশেষণ উৎকৃষ্ট, উৎকর্ষতা নয়।

শুদ্ধ প্রয়োগ

অপকর্ষ, অপকৃষ্টতা, আতিশয্য, অতিশয়তা, আলস্য, অলসতা, ঐক্য, একতা, কার্পণ্য, কৃপণতা, গাম্ভীর্য, গম্ভীরতা, চাতুর্য, চতুরতা, চাপল্য, চপলতা, দরিদ্রতা, (দারিদ্রতা নয়), দৈন্য, দীনতা, দৌর্বল্য, দুর্বলতা, বাহুল্য, বহুলতা, বৈচিত্র্য, বৈশিষ্ট্য, বিশিষ্টতা, ভারসাম্য, ভারসাম্যতা, মাধুর্য, মধুরতা, সারল্য, সরলতা, সারল্য, সাদৃশ্য, সদৃশতা, সৌজন্য, সৌহার্দ্য ইত্যাদি।

এই অশুদ্ধি-সংশোধন ছাড়াও আরো পড়ুন