ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়: একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়: একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—শুধু একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস, একটি চেতনা এবং একটি জাতি নির্মাণের পাঠশালা। ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’

0 1
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়: একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়: একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—শুধু একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস, একটি চেতনা এবং একটি জাতি নির্মাণের পাঠশালা। ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ নামে খ্যাত এই প্রতিষ্ঠানটি গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই ভূখণ্ডের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে আসছে। এর বিশাল প্রাঙ্গণ কেবল লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর হয়নি, বরং এটি একটি জাতির জন্ম এবং তার বেড়ে ওঠার প্রতিটি মুহূর্তের নীরব সাক্ষী। এই প্রবন্ধে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ইতিহাস, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে এর অবিস্মরণীয় ভূমিকা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরব।

প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস মূলত পূর্ব বাংলার মানুষের আত্মপরিচয় এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) এবং এর রদ (১৯১১) এই অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে একাধারে আশা ও হতাশার জন্ম দেয়। বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এবং এই অঞ্চলের মানুষের শিক্ষার চাহিদা মেটাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়।

বঙ্গভঙ্গ ও নতুন প্রদেশের স্বপ্ন

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ঢাকাকে রাজধানী করে ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম’ নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হলে এই অঞ্চলে শিক্ষা, প্রশাসন ও অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। কিন্তু কলকাতা কেন্দ্রিক এলিট শ্রেণি ও রাজনৈতিক নেতাদের তীব্র বিরোধিতার মুখে ১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করে। এই ঘটনা পূর্ব বাংলার মুসলিম নেতাদের, যেমন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এবং শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হককে গভীরভাবে হতাশ করে। তারা উপলব্ধি করেন যে, এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

ন্যাথান কমিশন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন

বঙ্গভঙ্গ রদের পর, ১৯১২ সালের ২১শে জানুয়ারি ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে এলে নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে এবং ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি জানায়। লর্ড হার্ডিঞ্জ এই দাবির যৌক্তিকতা উপলব্ধি করেন এবং আশ্বাস দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে, ১৯১২ সালের মে মাসে ব্যারিস্টার রবার্ট ন্যাথানের নেতৃত্বে 'ন্যাথান কমিশন' গঠিত হয়। এই কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯২০ সালে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন' ভারতীয় আইনসভায় পাস হয় এবং ১৯২১ সালের ১লা জুলাই এই বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে তার যাত্রা শুরু করে।

প্রথম শিক্ষাবর্ষ ও শুভ সূচনা


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে ৩টি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক এবং ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে। এর মধ্যে একজন ছাত্রী ছিলেন, লীলা নাগ, যিনি ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের ডিগ্রি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে এর প্রথম ব্যাচ গঠিত হয়। কার্জন হল, যা পূর্বে ঢাকা কলেজের অংশ ছিল, সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। প্রতিষ্ঠালগ্নে যে তিনটি আবাসিক হল ছিল, সেগুলো হলো: ঢাকা হল (বর্তমানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হল), জগন্নাথ হল এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। এই আবাসিক হলগুলোই পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড: অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষ ও কাঠামো

প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কঠোরভাবে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের দিকে মনোনিবেশ করে, যার ফলে এটি অল্প সময়ের মধ্যেই 'প্রাচ্যের অক্সফোর্ড' হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক বৈশিষ্ট্য, টিউটোরিয়াল পদ্ধতি এবং প্রথিতযশা শিক্ষকদের পাণ্ডিত্য একে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, এফ. সি. টার্নার, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, জি. এইচ. ল্যাংলি, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, স্যার এ. এফ. রহমান, আর. সি. মজুমদার-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত পণ্ডিতেরা এর প্রতিষ্ঠালগ্নে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

অনুষদ, বিভাগ ও ইনস্টিটিউট

মাত্র তিনটি অনুষদ (কলা, বিজ্ঞান ও আইন) এবং ১২টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, বর্তমানে (২০২৬ সাল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩টি অনুষদ, ৮৩টি বিভাগ, ১৩টি ইনস্টিটিউট এবং ৫৬টিরও বেশি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। সময়ের সাথে সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখার প্রসারের সাথে তাল মিলিয়ে এখানে নতুন বিভাগ ও ইনস্টিটিউট খোলা হয়েছে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

আবাসিক হল ও ছাত্র জীবন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর আবাসিক ব্যবস্থা। হলগুলো কেবল শিক্ষার্থীদের থাকার জায়গা নয়, এগুলো তাদের মানসিক বিকাশ, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সাংস্কৃতিক মনন তৈরির এক একটি কারখানা। প্রতিটি হল নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ভাস্বর। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, জগন্নাথ হল, ফজলুল হক মুসলিম হল, রোকেয়া হল—প্রত্যেকটি হলই বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। হলের ক্যান্টিন, রিডিং রুম, খেলার মাঠ এবং আড্ডাগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করে, যা সারাজীবনের জন্য থেকে যায়।

গ্রন্থাগার ও গবেষণা

১৮ হাজার বই নিয়ে যে গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার আজ বাংলাদেশের বৃহত্তম লাইব্রেরি। বর্তমানে এর সংগ্রহে নয় লক্ষেরও বেশি বই, জার্নাল এবং পাণ্ডুলিপি রয়েছে। এটি তিনটি ভবনে বিস্তৃত এবং গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এক бесцен্য ভান্ডার। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ এবং ইনস্টিটিউটগুলোও নিজস্ব সেমিনার লাইব্রেরি পরিচালনা করে, যা জ্ঞানচর্চাকে আরও সহজলভ্য করে তুলেছে।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছে এবং এটি স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছে। বস্তুত, এই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মুক্তি সংগ্রামের প্রধান সূতিকাগার।

ভাষা আন্দোলন ও রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ভাষার প্রশ্নটি সামনে আসে। ১৯৪৮ সালে এবং চূড়ান্তভাবে ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকেরাই প্রথম প্রতিবাদমুখর হন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। এই আত্মত্যাগই বাংলা ভাষাকে তার মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে এবং বাঙালির মনে জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করে।


বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন থেকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

ভাষা আন্দোলনের পর থেকে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছিল অগ্রভাগের সৈনিক। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং বিশেষ করে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল কিংবদন্তীতুল্য। গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহার মৃত্যু আন্দোলনকে এক নতুন মাত্রা দেয়, যা আইয়ুব খানের পতনকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত অধ্যায়, অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান রক্তাক্ষরে লেখা। ২৫শে মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। তারা শিক্ষক, ছাত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল), রোকেয়া হল এবং শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় চালানো হয় নারকীয় তাণ্ডব। মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস জুড়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অগণিত শিক্ষার্থী বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন। বিজয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে, ১৪ই ডিসেম্বর, জাতিকে মেধাশূন্য করার নীল নকশার অংশ হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর আল-বদররা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের (যেমন: মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, গিয়াসউদ্দিন আহমদ) বাসা থেকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।

স্বাধীনতা পরবর্তী ও বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

স্বাধীনতার পরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার পথচলা অব্যাহত রেখেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরিতে এই বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তবে এর চলার পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বিশ্ববিদ্যালয়টি আজকের অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে।

স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা

স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র যখনই হুমকির মুখে পড়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকেরা তার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। ১৯৮০-এর দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নূর হোসেন, ডা. মিলনদের পাশে থেকে সংগ্রাম করেছে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহ্য এতটাই গভীর যে, বিভিন্ন সময়ের গণ-আন্দোলন, যেমন ২৪-এর গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের মতো ঘটনাও ঘটে, যা এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।

বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা (২০২৬)

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কিছু আধুনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশ্ব র‍্যাংকিং-এ নিজেদের অবস্থান উন্নত করা, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল নিশ্চিত করা, ক্লাসরুমকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করা এবং সর্বোপরি ছাত্র রাজনীতির গুণগত মান বজায় রাখা এর মধ্যে অন্যতম। তবে আশার কথা হলো, সম্প্রতি কিউএস (QS) এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) এর মতো আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানের উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ে এটি ৫৮৪তম স্থান অর্জন করেছে, যা দেশের মধ্যে শীর্ষস্থান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলোও জাতীয় ইস্যুতে তাদের মতামত ব্যক্ত করে, যেমনটি সাম্প্রতিককালে বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি-এর আলোচনায় দেখা গেছে। এটি প্রমাণ করে যে, বিশ্ববিদ্যালয়টি এখনো দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।

উল্লেখযোগ্য প্রাক্তন শিক্ষার্থীবৃন্দ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অসংখ্য কৃতি ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছে যারা দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন:

  • রাজনীতি: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ বাংলাদেশের অধিকাংশ শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতা।
  • বিজ্ঞান: সত্যেন্দ্রনাথ বসু (বোসন কণার আবিষ্কারক), ড. কুদরাত-এ-খুদা, ড. মুহাম্মদ ইব্রাহিম।
  • অর্থনীতি: ড. মুহাম্মদ ইউনূস (শান্তিতে নোবেল বিজয়ী), অধ্যাপক রেহমান সোবহান।
  • সাহিত্য ও সংস্কৃতি: বুদ্ধদেব বসু, শামসুর রাহমান, হুমায়ূন আহমেদ, মুনীর চৌধুরী।
  • বিচার ব্যবস্থা: বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ।

ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির এক প্রধান কেন্দ্র। এর বিভিন্ন উৎসব এবং স্থাপনাগুলো জাতীয় ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত আড্ডা

টিএসসি: সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র

শিক্ষক-ছাত্র কেন্দ্র বা টিএসসি (Teacher-Student Centre) হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র। এখানকার সবুজ চত্বর, ক্যাফেটেরিয়া এবং অডিটোরিয়াম সারাদিন শিক্ষার্থীদের আড্ডা, গান, বিতর্ক, নাটকের মহড়া আর আলোচনায় মুখর থাকে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তাদের কার্যক্রম এখান থেকেই পরিচালনা করে।

পহেলা বৈশাখ ও অন্যান্য উৎসব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আয়োজনে পহেলা বৈশাখের 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' এখন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এটিকে 'মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালির এক সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, যার সূতিকাগার এই বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া অমর একুশে ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবসে বিশ্ববিদ্যালয় এক ভিন্ন রূপ ধারণ করে।

স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক ভবন

কার্জন হল, মোকাররম ভবন, অপরাজেয় বাংলা, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা, রাজু ভাস্কর্য—এগুলো কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়। প্রতিটি ভবনের সাথে জড়িয়ে আছে ইতিহাস আর আবেগ। কার্জন হলের লাল ইটের দালান যেমন ব্রিটিশ স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করে, তেমনি অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্যটি স্মরণ করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র-শিক্ষকদের অসামান্য বীরত্বের কথা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক বিভাগসমূহ (১৯২১)

অনুষদ বিভাগ
কলা সংস্কৃত ও বাংলা, ইংরেজি, শিক্ষা, ইতিহাস, আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ, ফার্সি ও উর্দু, দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি
বিজ্ঞান পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত
আইন আইন

উপসংহার

একশো পাঁচ বছরের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন, একটি রাষ্ট্রের জন্ম এবং একটি জাতির মনন তৈরিতে যে ভূমিকা রেখেছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটি বাংলাদেশের বাতিঘর। সময়ের সাথে সাথে হয়তো এর অনেক চ্যালেঞ্জ এসেছে, ভবিষ্যতেও আসবে। কিন্তু এর দেয়ালের প্রতিটি ইট, এর পথের প্রতিটি ধূলিকণা যে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক, তা-ই এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সকল সংকট মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি যোগাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে—এটাই সকলের প্রত্যাশা।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0
Saifwan

আমাদের শিক্ষামূলক ওয়েবসাইটে আপনাদের স্বাগতম! আমরা আনন্দিত যে আপনি আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন। আমাদের উদ্দেশ্য হলো সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা।

Comments (0)

User