কুরবানীর ইতিহাস ও ফজিলত
কুরবানীর ইতিহাস ও ফজিলত: আত্মত্যাগ ও নৈকট্যের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা (২০২৬ সংস্করণ) মুসলিম বিশ্বে প্রতি বছর যিলহজ মাসে বিপুল উৎসাহ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে যে ইবাদতটি পালিত হয়, তার নাম কুরবানী। এট
কুরবানীর ইতিহাস ও ফজিলত: আত্মত্যাগ ও নৈকট্যের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা (২০২৬ সংস্করণ)
মুসলিম বিশ্বে প্রতি বছর যিলহজ মাসে বিপুল উৎসাহ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে যে ইবাদতটি পালিত হয়, তার নাম কুরবানী। এটি শুধু একটি পশু জবাই করার প্রথা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে আল্লাহর প্রতি বান্দার নিঃশর্ত আনুগত্য, আত্মত্যাগ এবং নৈকট্য লাভের এক সুমহান ইতিহাস। ২০২৬ সালের এই আধুনিক সময়েও কুরবানীর মূল বার্তাটি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই বিশদ প্রবন্ধে আমরা কুরবানীর ইতিহাস, এর ফজিলত, বিধি-বিধান এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োগ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করব।
এই আর্টিকেলে যা যা থাকছে (Table of Contents)
- ভূমিকা: কুরবানী কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
- কুরবানীর সুপ্রাচীন ইতিহাস: হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ) এর অবিস্মরণীয় ত্যাগ
- কুরআন ও হাদিসের আলোকে কুরবানীর ফজিলত ও তাৎপর্য
- কুরবানীর বিধি-বিধান (২০২৬): যা অবশ্যই জানতে হবে
- কুরবানীর মাংস বন্টনের নিয়ম ও সামাজিক তাৎপর্য
- কুরবানীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও ব্যক্তিগত জীবনে এর প্রতিফলন
- আধুনিক প্রেক্ষাপটে কুরবানী: চ্যালেঞ্জ ও সমাধান (২০২৬)
- উপসংহার: কুরবানীর শাশ্বত বার্তা
ভূমিকা: কুরবানী কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কুরবানী একটি আরবি শব্দ, যা 'কুরব' মূল থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ নৈকট্য বা সান্নিধ্য। ইসলামি পরিভাষায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট দিনে (যিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে) নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পশু জবাই করাকে কুরবানী বলা হয়। এটি নিছক কোনো উৎসব নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা আল্লাহর প্রতি বান্দার চরম আনুগত্য এবং ভালোবাসার প্রতীক।
কুরবানীর মাধ্যমে একজন মুসলিম এই ঘোষণা দেন যে, আল্লাহর আদেশের সামনে তার নিজের ইচ্ছা, সম্পদ এবং ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই। তিনি তার প্রভুর সন্তুষ্টির জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। এই ইবাদতটি একদিকে যেমন আত্মিক পরিশুদ্ধি ঘটায়, তেমনি এর সামাজিক গুরুত্বও অপরিসীম।
কুরবানীর সুপ্রাচীন ইতিহাস: হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ) এর অবিস্মরণীয় ত্যাগ
কুরবানীর বর্তমান রূপটি মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর জীবনের এক অবিস্মরণীয় ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। আল্লাহ তা'আলা হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-কে বৃদ্ধ বয়সে পুত্র ইসমাইল (আঃ)-কে দান করেন। যখন ইসমাইল (আঃ) কৈশোরে উপনীত হন, তখন আল্লাহ ইব্রাহিম (আঃ)-কে স্বপ্নে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কুরবানী করার নির্দেশ দেন। পরপর তিনবার একই স্বপ্ন দেখার পর, তিনি বুঝতে পারেন যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক কঠিন পরীক্ষা এবং আল্লাহ তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র ইসমাইলকেই কুরবানী করতে আদেশ করছেন।
হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কোনো দ্বিধা না করে আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য প্রস্তুত হন এবং তাঁর পুত্র ইসমাইল (আঃ)-কে বিষয়টি খুলে বলেন। পুত্র ইসমাইল (আঃ) ছিলেন তাঁর পিতার মতোই আল্লাহর প্রতি অনুগত। তিনি বলেন, 'হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।' (সূরা আস-সাফফাত: ১০২)। এই কথোপকথন পিতা-পুত্রের আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং আত্মসমর্পণের এক নজিরবিহীন উদাহরণ স্থাপন করে।
যখন ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর পুত্রকে জবাই করার জন্য প্রস্তুত হলেন এবং গলায় ছুরি চালালেন, তখন আল্লাহর হুকুমে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। ইসমাইল (আঃ) এর পরিবর্তে একটি দুম্বা বা ভেড়া কুরবানী হয়ে যায়। আল্লাহ তাঁর খলিল (বন্ধু) ইব্রাহিমের ত্যাগ ও আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং তাঁর কুরবানী কবুল করে নিয়েছিলেন। সেই থেকেই এই নজিরবিহীন ত্যাগকে স্মরণ করে মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর ঈদুল আজহায় পশু কুরবানী করে থাকে।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে কুরবানীর ফজিলত ও তাৎপর্য
কুরআন ও হাদিসে কুরবানীকে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি আল্লাহর কাছে অন্যতম প্রিয় একটি আমল, যার মাধ্যমে বান্দা অফুরন্ত সওয়াব ও কল্যাণ লাভ করে। কুরবানী শুধু একটি প্রথা নয়, বরং এটি তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
কুরআনের আলোকে:
- পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা সরাসরি তাঁর উদ্দেশ্যে সালাত আদায় এবং কুরবানী করার নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা আল-কাওসারে বলা হয়েছে: "অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন।" (সূরা কাওসার: ২)।
- কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য যে তাকওয়া অর্জন, তা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে সূরা আল-হজ্জে: "এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, কিন্তু পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।" (সূরা হজ: ৩৭)। এর দ্বারা বোঝা যায়, পশুর রক্তপাত বা মাংস বিতরণ মূল লক্ষ্য নয়, বরং আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠা ও ভয়ই আসল বিষয়।
- অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, "বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ—সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যে।" (সূরা আল-আনআম: ১৬২)।
হাদিসের আলোকে:
- হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "কুরবানীর দিনে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় কোনো আমল মানুষ করে না। কিয়ামতের দিন এই পশু তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত হবে। আর কুরবানীর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা আনন্দের সাথে কুরবানী করো।" (তিরমিযি, ইবনে মাজাহ)।
- সাহাবায়ে কেরাম রাসূল (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, "হে আল্লাহর রাসূল! এই কুরবানী কী?" তিনি উত্তরে বলেন, "এটি তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আঃ)-এর সুন্নত।" তাঁরা আবার জিজ্ঞেস করলেন, "এতে আমাদের জন্য কী সওয়াব রয়েছে?" তিনি বললেন, "(পশুর) প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।" (ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমাদ)।
- রাসূল (সাঃ) নিজে প্রতি বছর কুরবানী করতেন। আনাস (রাঃ) বলেন, নবী (ﷺ) দুটি সাদা-কালো রঙের শিংযুক্ত মেষ দিয়ে কুরবানী আদায় করতেন। তিনি নিজ হাতে 'বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার' বলে সেগুলো জবাই করতেন।
- সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করে না, তার প্রতি রাসূল (সাঃ) কঠোর মনোভাব প্রকাশ করে বলেছেন, "যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে কিন্তু সে কুরবানী করলো না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।" (ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমাদ)।
কুরবানীর বিধি-বিধান (২০২৬): যা অবশ্যই জানতে হবে
কুরবানী একটি ইবাদত হওয়ায় এর সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে যা পালন করা আবশ্যক। এর মধ্যে অন্যতম হলো নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া, সঠিক পশু নির্বাচন করা এবং নির্দিষ্ট সময়ে কুরবানী করা। নিয়মগুলো মেনে চললেই এই ওয়াজিব ইবাদতটি সঠিকভাবে আদায় হবে।
কার উপর কুরবানী ওয়াজিব? (নিসাব পরিমাণ)
ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলিম নর-নারী, যে যিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও ঋণের অতিরিক্ত সাড়ে সাত তোলা (৮৭.৪৮ গ্রাম) স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা (৬১২.৩৬ গ্রাম) রুপা বা এর সমমূল্যের সম্পদের মালিক হবে, তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব (আবশ্যক)। পরিবারের একাধিক সদস্য নিসাবের মালিক হলে প্রত্যেকের উপর আলাদাভাবে কুরবানী ওয়াজিব। স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর কুরবানী আদায় হবে না, যদি স্ত্রী নিজেও নিসাবের মালিক হন।
কুরবানীর পশু সংক্রান্ত নিয়মাবলী
কুরবানীর জন্য নির্দিষ্ট ধরনের পশু এবং তাদের নির্দিষ্ট বয়সসীমা রয়েছে। পশু অবশ্যই সুস্থ ও নিখুঁত হতে হবে। যে পশুতে স্পষ্ট ত্রুটি রয়েছে, যেমন— এক চোখ কানা, স্পষ্ট খোঁড়া, অত্যন্ত দুর্বল বা কানের বা লেজের এক-তৃতীয়াংশের বেশি কাটা, তা দিয়ে কুরবানী শুদ্ধ হবে না।
নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে পশু ও তার অংশীদারিত্বের নিয়ম তুলে ধরা হলো:
| পশুর ধরণ | সর্বনিম্ন বয়স | অংশীদারিত্ব (শরিক) |
|---|---|---|
| ছাগল, ভেড়া, দুম্বা | পূর্ণ ১ বছর (তবে ৬ মাসের হৃষ্টপুষ্ট ভেড়া/দুম্বা দেখতে ১ বছরের মতো হলে জায়েজ) | ১ জন |
| গরু, মহিষ | পূর্ণ ২ বছর | সর্বোচ্চ ৭ জন |
| উট | পূর্ণ ৫ বছর | সর্বোচ্চ ৭ জন |
শরিকে বা ভাগে কুরবানী দিলে অবশ্যই গোশত ওজন করে নিখুঁতভাবে বন্টন করতে হবে; অনুমানের ভিত্তিতে ভাগ করা জায়েজ নয়। কারণ এতে ভাগের মধ্যে কম-বেশি হয়ে গেলে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কুরবানী করার সময় ও পদ্ধতি
কুরবানী করার নির্দিষ্ট সময় হলো যিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত। কোনো কোনো ফিকহী মতে ১৩ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্তও কুরবানী করা যায়। ঈদের নামাজের আগে কুরবানী করলে তা সাধারণ জবাই হিসেবে গণ্য হবে, কুরবানী হিসেবে নয়।
কুরবানী নিজ হাতে করা উত্তম। জবাই করার সময় পশুকে কিবলামুখী করে শুইয়ে 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বলে জবাই করতে হবে। ছুরি অবশ্যই ধারালো হতে হবে যেন পশুর অধিক কষ্ট না হয়। একটি পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই করা বা ছুরি ধার দেওয়া মাকরূহ।
কুরবানীর মাংস বন্টনের নিয়ম ও সামাজিক তাৎপর্য
কুরবানীর মাংস বন্টনের মুস্তাহাব বা উত্তম নিয়ম হলো এটিকে তিন ভাগে ভাগ করা। এক ভাগ নিজের এবং পরিবারের জন্য রাখা, দ্বিতীয় ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং তৃতীয় ভাগ সমাজের গরীব, দুঃস্থ ও অভাবী মানুষদের মধ্যে বিতরণ করা। এই বন্টন ব্যবস্থা কুরবানীর সামাজিক তাৎপর্যকে ফুটিয়ে তোলে।
কুরবানীর মাধ্যমে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকলের ঘরে ঈদের আনন্দ পৌঁছে যায়। এটি সামাজিক সংহতি, সহানুভূতি ও ভাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি করে। যখন একজন সামর্থ্যবান ব্যক্তি তার কুরবানীর মাংস দিয়ে একজন অভাবীর ঘরের প্রয়োজন মেটায়, তখন তাদের মধ্যে একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এটি ইসলামের দান বা সাদকার বৃহত্তর ধারণারই একটি প্রতিফলন। এর মাধ্যমে সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য সাময়িকভাবে হলেও কমে আসে এবং পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।
কুরবানীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও ব্যক্তিগত জীবনে এর প্রতিফলন
কুরবানীর মূল শিক্ষা হলো জাগতিক মোহ ও নফসের খাহেশাতকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিসর্জন দেওয়া। এটি শুধু একটি পশু জবাই নয়, বরং নিজের ভেতরের পশুত্ব, অর্থাৎ অহংকার, লোভ, হিংসা ও সম্পদের মোহকে জবাই করার প্রতীকী রূপ। এই ইবাদত থেকে একজন মুসলিম তার ব্যক্তিগত জীবনের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করতে পারে।
এর প্রধান আধ্যাত্মিক শিক্ষাগুলো হলো:
- তাকওয়া (Taqwa) অর্জন: কুরবানীর প্রধান উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা অন্তরে স্থাপন করা। বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে অন্তরের বিশুদ্ধতাই আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।
- নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম: নিজের প্রিয় সম্পদ ব্যয় করার মাধ্যমে একজন মুসলিম তার ভেতরের কৃপণতা ও দুনিয়ার ভালোবাসার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে শেখে। ঠিক যেমন একটি জাতি তার আদর্শগত লক্ষ্যে পৌঁছাতে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে, যেমনটা দেখা যায় বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির মতো আলোচনায়, তেমনি কুরবানী একজন ব্যক্তিকে তার নফসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়।
- ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা: হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর ধৈর্যের কথা স্মরণ করে জীবনে আসা পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর অগণিত নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা কুরবানীর অন্যতম শিক্ষা।
- সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ: আল্লাহর আদেশের সামনে বিনা প্রশ্নে মাথানত করার যে শিক্ষা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) দেখিয়েছেন, তা একজন মুমিনের জীবনের মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে কুরবানী: চ্যালেঞ্জ ও সমাধান (২০২৬)
২০২৬ সালের আধুনিক ও ব্যস্ত জীবনে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, কুরবানী পালন করার ক্ষেত্রে কিছু নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তবে ইসলামের প্রায়োগিক দিকনির্দেশনা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব।
শহুরে জীবনে কুরবানী ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
অ্যাপার্টমেন্ট বা ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে এলাকায় কুরবানী করা এবং এর বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কুরবানীর পর রক্ত, আবর্জনা ও পশুর উচ্ছিষ্টাংশ যত্রতত্র ফেলে রাখলে পরিবেশ দূষিত হয় এবং রোগ-জীবাণু ছড়ায়, যা ইসলামের পরিচ্ছন্নতার নীতির পরিপন্থী।
সমাধান:
- সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার নির্ধারিত স্থানে কুরবানী করা।
- কুরবানীর পর স্থানটি পানি ও জীবাণুনাশক দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করা।
- বর্জ্য নির্দিষ্ট ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলা এবং সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সহায়তা করা।
- মনে রাখতে হবে, "পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ"। তাই ইবাদতের পরিবেশকে দূষিত করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে যেমন স্বচ্ছতা ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন, যেমনটা আমরা আলোচনা করি যখন রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ প্রশ্নের মীমাংসা কীভাবে হবে তা নিয়ে, তেমনি কুরবানীর মতো একটি মহান ইবাদতের প্রতিটি ধাপ পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল হওয়া জরুরি।
অনলাইন বা প্রক্সি কুরবানী: শরعی দৃষ্টিকোণ ও সতর্কতা
প্রবাসে থাকা বা শহুরে ব্যস্ততার কারণে যাদের পক্ষে নিজে কুরবানী করা সম্ভব হয় না, তাদের জন্য প্রক্সি বা অনলাইন কুরবানী একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান আপনার পক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে কুরবানী করে এবং মাংস গরীবদের মাঝে বিতরণ করে।
শরعی দৃষ্টিকোণ: ইসলামে প্রতিনিধির মাধ্যমে কুরবানী করা সম্পূর্ণ জায়েজ। তবে এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সতর্কতা:
- প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সম্পর্কে খোঁজ নিন।
- তারা শরীয়তের নিয়ম (পশুর বয়স, স্বাস্থ্য, জবাইয়ের সময়) সঠিকভাবে পালন করছে কিনা, তা নিশ্চিত হন।
- পূর্বের কার্যক্রম সম্পর্কে রিভিউ বা মানুষের মতামত যাচাই করুন।
উপসংহার: কুরবানীর শাশ্বত বার্তা
কুরবানী কেবল একটি বার্ষিক ইবাদত বা ঐতিহ্য নয়, এটি মুসলিম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ত্যাগ, তাকওয়া, ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক জীবন্ত দর্শন। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর অবিস্মরণীয় আনুগত্য থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা পর্যন্ত—কুরবানীর বার্তা চিরন্তন ও শাশ্বত।
এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং তাঁর সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতির এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করা। যখন আমরা এই চেতনাকে অন্তরে ধারণ করে কুরবানী পালন করব, তখনই আমাদের এই ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হবে এবং আমাদের জীবন অর্থবহ হয়ে উঠবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরবানীর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করার এবং সে অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)